বিশ্বায়ন / গ্লোবালাইজেশন - বাংলা প্রবন্ধ রচনা

ভূমিকা : জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বর্তমানে এক বহুল আলোচিত বিষয় ‘বিশ্বায়ন’ বা  ‘গ্লোবালাইজেশন’। ধারণাগত অর্থে বিশ্বায়ন বলতে বোঝায় ‘বিশ্বের জ্ঞান-বিজ্ঞান, প্রযুক্তি-সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও পরিবেশের তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক দৃষ্টিকোণ থেকে একই দিকে উত্তরণ।’ উত্তর-দক্ষিণ ও পূর্ব-পশ্চিমের মধ্যে ঐক্য সৃষ্টি করাই এর মূল উদ্দেশ্য। তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশসহ অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশে বিশ্বায়নের প্রভাব সম্পর্কে পর্যালোচনা অত্যন্ত সময়োপযোগী একটি বিষয়। 

 
বিশ্বায়ন : বিশ্বায়ন হলো পারস্পরিক ক্রিয়া ও আন্তঃসংযোগ সৃষ্টিকারী এমন একটি পদ্ধতি যা বিভিন্ন জাতির সরকার, প্রতিষ্ঠান এবং জনগণের মধ্যে সমন্বয় ও মিথস্ক্রিয়ার সূচনা করে। অন্যভাবে বলা যায়, বিশ্বায়ন হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যার সাহায্যে রাষ্ট্রকেন্দ্রিক সংস্থাসমূহ বিশ্বজুড়ে আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক গড়ে তোলে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে বিশ্বায়ন বলতে বিশ্ব অর্থনীতির সাথে একাত্মতা বোঝায়। ‘উৎপাদনের ক্ষেত্রে কোনো বাধা নয় প্রতিবন্ধকতা থাকবে না শুল্ক ও বাণিজ্যে, একমাত্র মুক্ত বাণিজ্যেই জাতির অর্থনৈতিক উন্নয়নের সর্বোত্তম পন্থা’-এরূপ অর্থনৈতিক উদারীকরণের পথ ধরেই জন্মলাভ করেছে মুক্তবাজার অর্থনীতির ধারণা। দানা বেঁধেছে বিশ্বায়ন। 
 
বিশ্বায়নের কারণ : বিশ্বায়নের কারণ বহুবিধ। তবে সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে মুনাফা অর্জন ও আর্থিক আধিপত্য বিস্তার। এক সমীক্ষায় দেখা যায়, গ্লোবাল কোম্পানিসমূহের সম্পদের এক বিশাল অংশই নিজ দেশের (Home Country) বাইরে অবস্থিত এবং কোনো কোনো গ্লোবাল কোম্পানির বিক্রিয়র সিংহভাগই অনুষ্ঠিত হয় বহির্বিশ্বে। বিশ্বায়নের অন্যান্য কারণসমূহ নিম্নরূপ : 
 
১. ছোট হয়ে আসছে পৃথিবী : গতিশীল যোগাযোগ, উন্নত যাতায়াত ব্যবস্থা, ক্রমবর্ধমান আর্থিক সঞ্চালন এবং দ্রুত প্রযুক্তিগত উন্নয়নের ফলে সময় ও দূরত্বের ব্যবধান এতই হ্রস পেয়েছে যে, একটি বৃহৎ ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের পক্ষে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বিচরণ বর্তমানে কোনো কষ্টসাধ্য ব্যাপারই নয়। 
 
২. আকর্ষণীয় পণ্যের বাজার বিস্তৃতি : যেকোনো আকর্ষণীয় পণ্যের বাজার সহজেই এক দেশ থেকে অন্য দেশে পরিব্যাপ্ত হয়। উদাহরণস্বরূপ কোকাকোলা বা টয়োটা গাড়ির কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। 
 
৩. সস্তা শ্রম ও কাঁচামাল ব্যবহার : উন্নত বিশ্বে শ্রম ও কাঁচামাল ব্যয়বহুল বিধায় অনেক বড় কোম্পানি গ্লোবাল কার্যক্রম গ্রহণের মাধ্যমে সস্তা শ্রম ও কাঁচামাল ব্যবহারের সুযোগ গ্রহণে আগ্রহী হয়। 
 
৪. বিনিয়োগের ঝুঁকি হ্রাস : কোনো একক দেশে বিনিয়োগ অনেক সময় ঝুঁকিপূর্ণ বলে বিবেচিত হতে পারে। এরূপ ঝুঁকি এড়ানোর লক্ষ্যে বিভিন্ন দেশে বিনিয়োগ ও উৎপাদনের সিদ্ধান্ত সুফল বয়ে আনতে পারে। 
 
৫. বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার উদ্ভব : World Bank, WTO, IMF, EEC, NAFTA, SAPTA, ASEAN ইত্যাদি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সংস্থা গঠনের মাধ্যমে বিশ্বায়ন প্রক্রিয়া যে বহু গুণে ত্বরান্বিত হয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। 
 
বিশ্বায়নের ব্যাপ্তি : বর্তমানে আমাদের জীবনযাত্রার প্রায় সকল ক্ষেত্রে বিশ্বায়নের বিস্তার ঘটেছে। বিশ্বায়নের বিস্তারকে নিম্নোক্তভাবে আলোচনা করা যেতে পারে : 
 
১. প্রযুক্তিগত বিশ্বায়ন : শিল্প বিপ্লবের সময় থেকেই এই ধরনের বিশ্বায়ন শুরু হয়েছে। ঐ সময় যে সকল যুগান্তকারী যান্ত্রিক আবিষ্কার সাধিত হয় তার ফলে পৃথিবীর মানুষ পরস্পরের কাছাকাছি আসতে শুরু করে। যান্ত্রিক উৎপাদন থেকে যান্ত্রিক যাতায়াত ও যোগাযোগের সুফল ভোগ করতে মানুষ তৎপর হয়ে ওঠে। পৃথিবীর এক প্রান্তে তৈরি পণ্য অপর প্রান্তে সহজলভ্য হয়। আর এভাবেই ঘটে প্রযুক্তিগত বিশ্বায়নের বিস্তার। 
 
২. তথ্যগত বিশ্বায়ন : এরূপ বিশ্বায়নের ইতিহাস বেশি দিনের নয়। বিগত দুই দশকে এর অভূতপূর্ব উন্নয়ন সাধিত হয়। যদিও প্রযুক্তির সাথেই এর সম্পর্ক তবু যোগাযোগের ক্ষেত্রে বহুমাত্রিক উন্নয়নের ফলে বর্তমান যুগকে বলা হয় তথ্যপ্রযুক্তির যুগ। তথ্য আদান-প্রদানে প্রযুক্তির ব্যবহার বিশ্বায়নের গতিকে বহু গুণে ত্বরান্বিত করেছে। 
 
৩. সামরিক বিশ্বায়ন : আন্তঃমহাদেশীয় মিসাইল সিস্টেমসহ বিভিন্ন অত্যাধুনিক যুদ্ধাস্ত্র আবিষ্কারের ফলে পৃথিবীর যে কোনো দেশকে আগ্রাসনের শিকারে পরিণত করা বর্তমানে খুবই সহজ। তবে এর ফলে দরিদ্র ও অনুন্নত দেশসমূহ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশ্ব নিরাপত্তার নামে আমেরিকা-ব্রিটেন মহাশক্তি বর্তমানে যে কোনো সময় পৃথিবীর যে কোনো অঞ্চলে আগ্রাসন চালাতে সক্ষম। 
 
৪. পরিবেশগত বিশ্বায়ন : মানুষের কর্মকাণ্ড, বিশেষত শিল্প ও সমরাস্ত্র সংক্রান্ত আচার-আচরণে পরিবেশগত ভারসাম্য বিনষ্ট হচ্ছে। বায়ুদূষণ, পানিদূষণসহ বিভিন্ন দূষণের কারণে গাছপালা, মাটি ইত্যাদি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এক দেশের পরিবেশ দূষণের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পার্শ্ববর্তী দেশসমূহ। 
 
৫. সামাজিক-রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিশ্বায়ন : বিশ্বায়নের ফলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সামাজিক-রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন সাধিত হচ্ছে। তৃতীয় বিশ্বর দেশসমূহ অনেক ক্ষেত্রে অপসংস্কৃতির শিকারে পরিণত হচ্ছে। নিজেদের সামাজিক মূল্যবোধ অনেক ক্ষেত্রেই ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে। বৃহৎ শক্তি যে রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছে তার ফলে সামাজিক-সাংস্কৃতিক আবহাওয়া পাল্টে যাচ্ছে। 
 
বিশ্বায়নের প্রভাব : বিশ্বায়নের ধারণা ক্রমে পরিব্যাপ্তি লাভ করছে। বিশেষত অর্থনীতি ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে এর প্রভাব ব্যাপকাকারে ছড়িয়ে পড়ছে। বিশ্বায়নের প্রভাবকে ইতিবাচক ও নেতিবাচক এ দুভাবে আলোচনা করা যেতে পারে। 
 
বিশ্বায়নের ইতিবাচক প্রভাব : জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্নয়ন ও তথ্যপ্রযুক্তির দ্রুত প্রসারে আজ পৃথিবী যে সত্যি সত্যিই ছোট হয়ে আসছে তার প্রমাণ পেতে বেশি দূর যেতে হয় না। ঘরে বসেই কম্পিউটার ও ইন্টারনেটের বদৌলতে সমগ্র পৃথিবীর খোঁজখবর পাওয়া যায়। এ সবই বিশ্বায়নের ইঙ্গিত বহন করে। বিশ্বায়নকে তাই উপেক্ষা করা দুরূহ। বিশ্বায়নের ইতিবাচক প্রভাবসমূহ নিম্নরূপ : 
 
১. আন্তর্জাতিক সম্পর্ক উন্নয়ন : বিশ্বায়নের প্রভাবে বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক জোরদার হচ্ছে। অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রগুলো একে অপরের ওপর নির্ভরশীল হচ্ছে। বিভিন্ন মাত্রাভেদে এ পারস্পরিক নির্ভরতাই বিশ্বায়নের পক্ষে একটি বড় সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করছে। বিশ্বায়নের ফলে ইউরোপের দেশসমূহ ইতিমধ্যে এক হয়ে গেছে। 
 
২. বৃহদায়তন কর্মকাণ্ডের সুবিধা : বিশ্বায়নের ফলে যে বৃহৎ বাজার ব্যবস্থার ব্যাপ্তি হয়েছে, তাতে বৃহদায়তন উৎপাদন ও বিপণন সহজসাধ্য হয়েছে। এতে একদিকে হ্রাস পাচ্ছে উৎপাদন ব্যয়, অন্যদিকে বৃদ্ধি পাচ্ছে মুনাফার পরিমাণ। 
 
৩. ভৌগোলিক শ্রমবিভাগ ও বিশেষায়ন : বিশ্বায়নের ফলে ভৌগোলিক শ্রমবিভাগ ও বিশেষায়নের ক্ষেত্রে প্রসারিত হচ্ছে। ফলে প্রতিটি দেশ তার আপেক্ষিক সুবিধা অনুযায়ী উৎপাদনশীল কাজে নিয়োজিত থাকতে পারছে। 
 
৪. গ্লোবাল ভাবমূর্তি উন্নয়ন : গ্লোবাল পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের ফলে সর্বত্র পণ্যের একই রূপ ভাবমূর্তি সৃষ্টি হয়। এতে পণ্যের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে। উদাহরণস্বরূপ, বলা যেতে পারে, কোকাকোলা বা পেপসির এ জাতীয় গ্লোবাল ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছে যার ফলে বিশ্বব্যাপী এদের গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। 
 
৫. অবাধ বাণিজ্যে সুযোগ সৃষ্টি : বিশ্বায়নের ফলে বিভিন্ন দেশের মধ্যে অবাধ বাণিজ্য সহজসাধ্য হয়েছে। ই-কমার্সের বদৌলতে আলাদা মাত্রা ও গতি সঞ্চারিত হয়েছে এ অবাধ বাণিজ্যে। পৃথিবীর এক প্রান্তে বসে অন্য প্রান্তের সাথে ব্যবসায়ের কাজ অতি দ্রুত সমাধা করা এখন কোনো কঠিন ব্যাপার নয়। 
 
বিশ্বায়নের নেতিবাচক প্রভাব : বিশ্বায়নের নেতিবাচক প্রভাব লক্ষ্য করা যায় উন্নয়নশীল দেশসমূহে। এ কারণেই এসব দেশের কৃষক সম্প্রদায়, শ্রমিক শ্রেণী, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ইত্যাদি শ্রেণীর লোকেরা বিশ্বায়নবিরোধী আন্দোলনে রসদ যোগায়। নিচে বিশ্বায়নের নেতিবাচক প্রভাবসমূহ আলোচনা করা হলো : 
 
১. অর্থনৈতিক শোষণ ও মেধাপাচার : মুক্তবাজার অর্থনীতির আওতায় বিশ্বায়ন উন্নত দেশের জন্য বিশ্বসম্পদের দ্বার খুলে দিলেও দরিদ্র বা পশ্চাৎপদ দেশের জন্য তা একটি বড় অভিশাপস্বরূপ। বিশ্বায়নের ফলে দরিদ্র দেশের মেধা ও সম্পদ অবাধে পাচার হচ্ছে ধনী দেশে। এতে গরিব দেশ হচ্ছে আরো গরিব, আর ধনী দেশ হচ্ছে আরো ধনী। 
 
২. রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা রক্ষা কঠিন : বিশ্বায়নের ফলে গরিব দেশগুলোর পক্ষে তাদের রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা রক্ষা করাও একটি দুঃসাধ্য ব্যাপারে পরিণত হচ্ছে। ইন্টারনেট, ই-মেইল, ফ্যাক্স ইত্যাদির মাধ্যমে যে কোনো গোপনীয় দলিল, সংবাদ, তথ্য অতি দ্রুত বিদেশী প্রতিপক্ষের হাতে চলে যেতে পারে। এক্ষেত্রেও পশ্চাৎপদ দেশগুলোই মার খাচ্ছে ধনী দেশগুলোর কাছে। 
 
৩. শিক্ষাব্যবস্থায় বিপর্যয় : বিশ্বায়ন শিক্ষা ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে গরিব দেশগুলোর বিরুদ্ধে আগ্রাসী ভূমিকা পালন করছে। উন্নত বিশ্বের শিক্ষা ও প্রযুক্তি উন্নত বিধায় অনুন্নত দেশসমূহকে তা থেকে উপকৃত হওয়ার ক্ষেত্রে একদিকে যেমন ব্যয় করতে হচ্ছে প্রচুর অর্থ, অন্যদিকে ভেঙে পড়ছে তাদের নিজস্ব শিক্ষাব্যবস্থা ও প্রযুক্তির ভিত্তি। 
 
৪. বেকার সমস্যা বৃদ্ধি : বিশ্বায়নের ফলে উৎপাদন ব্যবস্থায় উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশে শিল্প কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ফলে এসব দেশে ভয়াবহ বেকারত্ব দেখা দিচ্ছে। 
 
বিশ্বায়ন ও বাংলাদেশ : উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সাধারণত বিশ্বায়নের নেতিবাচক প্রভাবই বেশি লক্ষ্য করা যায়। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। নিচে এ সম্পর্কে আলোচনা করা হলো : 
 
১. বিদেশী পণ্যের প্রসার : বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ার চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। মুক্তবাজার অর্থনীতি আমাদের স্পর্শ করছে কিন্তু এর প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি লাভ করার মতো পরিবেশ বা উপাদানসমূহ বর্তমানে আমাদের দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণে নেই। ফলে অবাধ বাজারের নামে বাংলাদেশ ক্রমাণ্বয়ে বিদেশী পণ্যের বাজারে পরিণত হচ্ছে। 
 
২. অসুসংহত বাজার কাঠামো : বিশ্বব্যাংক, আইএমএফসহ দাতা গোষ্ঠীর বিভিন্ন কঠোর শর্ত আরোপের কারণে বাংলাদেশ দেশীয় মুদ্রা ও পুঁজির বাজারে কোনো সুসংহত কাঠামো অর্জন করতে পারেনি। ফলে দেশে রপ্তানির পরিমাণ প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়েনি। অন্যদিকে এ দেশে বৈদেশিক বিনিয়োগের পরিমাণ আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পেয়েছে। 
 
৩. নিম্ন মানব উন্নয়ন সূচক : নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের মতে, ‘মানব উন্নয়নকে বাদ দিয়ে কখনো বিশ্বায়ন সম্ভব নয়। যেসব দেশের মানব উন্নয়ন সূচক অত্যন্ত কম তারা বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ায় হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়বে।’ বাংলাদেশে মানব উন্নয়ন সূচক নিম্ন অবস্থানে বিদ্যমান। তাই বর্তমান অবস্থায় বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর সাথে তাল মিলিয়ে চলা বাংলাদেশের জন্য সত্যিই দুরূহ ব্যাপার। 
 
৪. বিশ্ব অর্থনৈতিক বাজারে প্রবেশের তাগিদ : উন্নত বিশ্ব বাংলাদেশকে বিশ্ব অর্থনৈতিক বাজারে প্রবেশের তাগিদ দিচ্ছে। অথচ অর্থনৈতিক বিশ্বায়নের ফলে এশিয়ার মুদ্রাবাজার ক্রমাবনতিশীল। উন্নয়নশীল দেশগুলোর মুদ্রাবাজারের পতনের পাশাপাশি এসব দেশের প্রধান প্রধান স্টক মার্কেটেও ধস অব্যাহত রয়েছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে অস্থিতিশীল অর্থনৈতিক কাঠামোবেষ্টিত বাংলাদেশ প্রতিযোগিতামূলক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে কতটুকু স্থায়িত্ব অর্জন করার ক্ষমতা রাখে তা চিন্তার বিষয়। 
 
৫. বিশ্বজনীন প্রতিযোগিতায় ব্যর্থ : অর্থনৈতিক এবং প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ বিশ্বজনীন প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হবার সামর্থ্য অর্জন করতে পারেনি। চোরাচালানের মাধ্যমে ভারতীয় পণ্যের প্রবেশ বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজার ব্যবস্থা ও জাতীয় অর্থনীতিতে মারাত্মক বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করছে। তাই বাংলাদেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো অর্থনৈতিক কাঠামো দাঁড় না করিয়ে বিশ্বায়নে অনুপ্রবেশ দেশের জন্য বুমেরাং হয়ে দেখা দেবে। 
 
বিশ্বায়নের ভবিষ্যৎ : ভবিষ্যৎ সব সময় অনিশ্চয়তার। তারপরও কিছু কিছু ক্ষেত্রে যুগোপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করলে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎকে সাফল্যমণ্ডিত করে তোলা অনেকাংশে সম্ভবপর হয়। বর্তমানে বিশ্বায়নের যে ধারা তাতে ধনী দেশগুলো ধনী হচ্ছে এবং গরিব দেশগুলো আরো বেশি গরিব হচ্ছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণ পেতে হলে ধনী দেশগুলোকে গরিব দেশগুলোর প্রতি আরো বেশি নমনীয় ও সহনশীল হতে হবে, পাশাপাশি বাজার অর্থনীতিকে আরো বেশি সমাজনৈতিক ও কল্যাণমুখী হতে হবে। ধনী দেশগুলো উদার ও সহনশীল হলে বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভবিষ্যতে নিম্নোক্ত সুবিধা পাওয়া যাবে : 
১. অবাধ তথ্য-প্রযুক্তি বিনিময় করা যাবে; 
২. কমদামে পণ্যভোগ করা যাবে; 
৩. গরিব দেশের শিক্ষার্থীরা সহজেই উন্নত দেশের শিক্ষা গ্রহণ করতে পারবে; 
৪. যোগাযোগ ব্যবস্থার অভূতপূর্ব উন্নতি ঘটবে; 
৫. বিশ্বব্যাপী দারিদ্র্য হ্রাস পাবে; 
৬. চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নতি হবে অর্থাৎ গরিব দেশগুলো সুচিকিৎসার আওতায় আসবে; 
৭. আন্তর্জাতিক সম্পর্কোন্নয়ন ঘটবে; 
৮. যুদ্ধের ধামামা হ্রাস পাবে; 
৯. কূটনৈতিক উন্নয়ন ঘটবে; 
১০. জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন ঘটবে ইত্যাদি। 
 
উপসংহার : আধুনিক সভ্যতার গতিশীল চক্রের এক অবশ্যম্ভাবী ফল বিশ্বায়ন। তাই বিশ্বায়নকে নব্য উপনিবেশবাদ বলে ঠেকিয়ে রাখা যাবে না। বিশ্বায়নকে যত নেতিবাচক বিশেষণেই ভূষিত করা হোক না কেন, বিশ্বায়ন এগিয়ে যাবে তার আপন গতিতে। তাই এরূপ বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট থেকে কোনো রাষ্ট্রই দূরে থাকতে পারে না। তবে পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়া বিশ্বায়নের পথে অগ্রসর হলে তা বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বিপর্যয় ডেকে আনবে।
আর অর্থনৈতিক বিশ্বায়ন তখনই ফলপ্রসূ ও কার্যকর হবে যখন এর সুফল সর্বত্র সমানভাবে বণ্টন করা যাবে। এজন্য প্রয়োজন সুষম মানের সম্পদ উন্নয়ন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন, সম্পদের সুষম বণ্টন ও স্বচ্ছ প্রশাসনিক কাঠামো। তবেই বিশ্বায়নের পথে বাংলাদেশের যাত্রা হবে ফলদায়ক।
Mise à niveau vers Pro
Choisissez le forfait qui vous convient
Lire la suite
Otvut https://otvut.com