বাক্যে সাধু ও চলিত শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে পার্থক্য - বাংলা ব্যাকরণ
সাধু ও চলিত ভাষায় বাক্যে শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছু পার্থক্য লক্ষ করা যায়। এমন কিছু শব্দ আছে যেগুলো কেবল সাধু ভাষাতেই ব্যবহৃত হয়; অন্যদিকে কিছু শব্দ কেবল চলিত ভাষাতেই প্রত্যাশিত।
[১] তৎসম-অতৎসম শব্দের প্রয়োগ
সাধু ভাষায় তৎসম শব্দের বহুল ব্যবহার দেখা যায়। পক্ষান্তরে চলিত ভাষায় ঐসব তৎসম শব্দের পরিবর্তে সমার্থক অতৎসম (তদ্ভব, দেশী, বিদেশী) শব্দের ব্যবহার হয়ে থাকে।
|
সাধু
|
চলিত
|
|
অন্তঃকরণ
|
মন
|
|
অধ্যয়ন
|
পড়া
|
|
অভিপ্রায়
|
ইচ্ছা
|
|
উত্তমর্ণ
|
মহাজন
|
|
গলদেশ
|
গলা
|
|
তলদেশে
|
তলায়
|
|
দর্পণ
|
আয়না
|
|
নিষ্ঠীবন
|
থুতু
|
|
বঙ্গিম
|
বাঁকা
|
|
সন্নিধানে
|
কাছে
|
|
সম্যক
|
যথেষ্ট
|
|
স্কন্ধ
|
কাঁধ
|
[২] সমাসবদ্ধ শব্দ প্রয়োগে পার্থক্য
সাধু ভাষায় দীর্ঘ সমাসবদ্ধ শব্দের প্রয়োগ বেশি। এ ধরনের প্রয়োগ ভাষাকে গাম্ভীর্য দেয়। চলিত ভাষায় সমাসবদ্ধ শব্দ যতটা সম্ভব পরিহার করা হয়ে থাকে। ভাষান্তরের সময়ে তই সাধু ভাষার সমাসবন্ধ পদকে চলিত ভাষায় ভেঙ্গে ভেঙ্গে সহজ করে লেখা হয়। যেমন
|
সাধু
|
চলিত
|
|
অভিবাদনপূর্বক
|
অভিবাদন করে
|
|
উল্লেখশ্রবণমাত্র
|
কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই
|
|
কিয়ৎক্ষণে
|
কয়েক মুহূর্তে
|
|
দামেস্কাধিপতি
|
দামেস্কের অধিপতি
|
|
দারুনির্মিত
|
কাঠের তৈরি
|
|
নানাভরণভূষিত
|
নানা রকম গয়না পরা
|
|
পুরণার্থ
|
পূরণের জন্যে
|
|
বাষ্পবারি বিমোচন
|
চোখের জল ফেলা
|
|
বহুদিনান্তরে
|
বহু দিন পরে
|
|
মনুষ্য সমাজের
|
মানব সমাজের
|
|
রাজাজ্ঞা প্রাপ্তিক্রমে
|
রাজার আদেশ পাওয়ার পর
|
|
সঙ্গীতশ্রবণলালসা
|
গান শোনার লোভ
|
[৩] সন্ধিবদ্ধ শব্দের প্রয়োগে পার্থক্য
সাধু ভাষায় সন্ধিবদ্ধ পদের ব্যবহার বেশি। বিষয়ের কারণে অপরিহার্য না হলে চলিত ভাষায় আড়ম্বরমুখী সন্ধিবন্ধ শব্দ যতটা সম্ভব পরিহার করা হয়। প্রয়োজনে সন্ধিবদ্ধ শব্দ ভেঙে সহজ করে লেখা হয় কিংবা তদ্ভব রূপ দেওয়া হয়।
|
সাধু
|
চলিত
|
|
উৎসবার্থ
|
উৎসবের জন্যে
|
|
গাত্রোত্থান
|
ওঠা, গা তোলা
|
|
তদুপরি
|
তার উপরে
|
|
তদ্দর্শনে
|
তা দেখে
|
|
তদ্বিপরীত
|
তার বিপরীত
|
|
তদ্বিষয়ে
|
সে বিষয়ে
|
|
তন্নিমিত্ত
|
তার জন্যে
|
|
পুনরাভিবাদন
|
আবার অভিবাদন
|
|
প্রত্যুত্তরে
|
তার উত্তরে / জবাবে
|
|
প্রথানুসারে
|
প্রথা অনুসারে
|
|
মস্তকোপরি
|
মাথার উপরে
|
|
মনস্কামনা
|
মনের ইচ্ছা
|
|
রসাভিষিক্ত
|
রসে অভিষিক্ত
|
|
রাজাজ্ঞা
|
রাজার হুকুম
|
[৪] শব্দ দ্বিত্বের প্রয়োগে পার্থক্য
সাধু ভাষায় শব্দদ্বিত্ব প্রয়োগের রীতি নেই। তা চলিত ভাষার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য। যেমন আইঢাই, আধাআধি, উসখুস, কাছাকাছি, ছাইফাই, ফিসফিস, ফ্যালফ্যাল ইত্যাদি চলিত ভাষার নিজস্ব সম্পদ।
[৫] ধ্বন্যাত্মক শব্দের প্রয়োগে পার্থক্য
ধ্বন্যাত্মক শব্দের ব্যবহার সাধু ভাষায় বিরল। এ ধরনের শব্দ চলিত ভাষায়ই প্রচুর ব্যবহৃত হয়। যেমন : কুচকুচে (কালো), ক্যাঁট্কেটে (রঙ), খাঁখাঁ (রোদ), গন্গনে (আগুন), ঝম্ঝম্ (বৃষ্টি), ঝিরঝির (বাতাস), টুকটুকে (লাল), ধবধবে (সাদা), ফুরফুরে (মেজাজ), শোঁ-শোঁ (হাওয়া), ইত্যাদি।
[৬] বাগ্ধারা ও প্রবাদ-প্রবচনের প্রয়োগে পার্থক্য
বিশিষ্টার্থক পদ (idiom) তথা বাগ্ধারা, প্রবাদ-প্রবচন ইত্যাদিও চলিত ভাষার নিজস্ব সম্পদ। এগুলো চলিত ভাষাতেই সহজে খাপ খেয়ে যায়। সাধু ভাষায় এদের ব্যবহার নেই বললেই চলে। এ ধরনের প্রয়োগ অনেক সময় সাধু ভাষাকে কৃত্রিম করে তোলে। যেমন : ‘ধান ভানতে ভাঙা কুলো’, ‘নাচতে না জানলে উঠোন বাঁকা’ ইত্যাদি চলিত ভাষারই সম্পদ।
[৭] অলংকার প্রয়োগে পার্থক্য
প্রাচীন রীতির সমাসবদ্ধ উপমা প্রয়োগ সাধু ভাষার স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। প্রদত্ত উদাহরণগুলোর মতো আলংকারিক শব্দপ্রয়োগ চলিত ভাষায় দেখা যায় না : ঋণজাল, নবনীরদ-নন্দিত, বিষাদ-বারিপ্রবাহ, লোভরিপু, লোভানলে আহুতি, যাতনাযন্ত্রে পেষণ, শোকসিন্ধু ইত্যাদি।
[৮] বাক্যরীতিতে পার্থক্য
বাক্যে পদ সংস্থাপনের দিক থেকে সাধু ও চলিত ভাষায় বেশ পার্থক্য রয়েছে। সাধু ভাষায় বাক্য সংস্থাপন সুনির্দিষ্ট পদ্ধতিনির্ভর। বাক্যের প্রথমে উদ্দেশ্য ও পরে বিধেয় থাকে। সাধু ভাষায় ক্রিয়াপদ সাধারণত বাক্যের শেষে বসে এবং বাক্যের পদক্রম কর্তা-কর্ম-ক্রিয়া এই বিন্যাসক্রম লঙ্ঘন করে না। যেমন :
সিরাজউদ্দৌলা ছদ্মবেশে পলাশী ত্যাগ করিয়া মুর্শিদাবাদ অভিমুখে যাত্রা করিলেন।
এই বাক্যে ক্রিয়াপদকে অন্যত্র বসালে বাক্যের সাবলীলতা আড়ষ্ট হতে পারে।
পক্ষান্তরে চলিত ভাষার বাক্যরীতিতে ক্রিয়াপদ বাক্যের শেষে নাও বসতে পারে। এই রীতিতে পদ সংস্থাপনে অনেক বেশি স্বাধীনতা থাকে। যেমন :
সন্ত্রাসীরা পুলিশের তাড়া খেয়ে বস্তির দিকে ছুটল।
পুলিশের তাড়া খেয়ে সন্ত্রাসীরা ছুটল বস্তির দিকে।
পুলিশের তাড়া খেয়ে বস্তির দিকে ছুটল সন্ত্রাসীরা।
ভাবগাম্ভীর্যের (tone) পার্থক্য
সাধু ভাষার বাক্য সাধারণভাবে চলিত রীতির বাক্যের চেয়ে দীর্ঘতর হয়ে থাকে। সাধু ভাষায় জটিল ও যৌগিক বাক্যের ব্যবহারও বেশি। ফলে বাক্যের উচ্চারণে সাধু রীতিতে এক ধরনের ভাবগাম্ভীর্যের সৃষ্টি হয়। সমাসবদ্ধ ও সন্ধিবদ্ধ শব্দ এবং তৎসম শব্দের পূর্ণধ্বনিময় উচ্চারণের কারণেও সাধু রীতিতে ভাবগাম্ভীর্যের বৃদ্ধি ঘটে।
পক্ষান্তরে অনতিদীর্ঘ বাক্যে বিন্যস্ত চলিত ভাষা স্বচ্ছ তরঙ্গিত ও অন্তরঙ্গ সুরধ্বনিময় হয়ে থাকে।